যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিপক্ষে ইরানের মূল শক্তি: কতটা শক্তিশালী তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার?

Image 11

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে যে আগ্নেয়গিরি সদৃশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা। সম্প্রতি মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহতের ঘটনায় পুরো অঞ্চল এখন এক অনিশ্চিত যুদ্ধের মুখে। তেহরান ইতিমধ্যে তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ব্যবহার করে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’ এর নতুন ধাপ শুরু করেছে। সমর বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিচিত্র সমরাস্ত্র এবং বিশেষ করে তাদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল ভাণ্ডার বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমা শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব ইরানের সেই সামরিক শক্তির উৎস ও গভীরতা।

মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার: তেহরানের প্রধান শক্তির উৎস

সামরিক কৌশলবিদদের মতে, ইরান গত তিন দশকে তাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের তুলনায় বড়। আকাশপথে সরাসরি যুদ্ধবিমান নিয়ে লড়াই করার চেয়ে ইরান সবসময় তাদের মিসাইল প্রযুক্তির ওপর বেশি বিনিয়োগ করেছে। তেহরানের এই বিশাল ভাণ্ডারকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

১. স্বল্পপাল্লার বিধ্বংসী ক্ষমতা: ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘জুলফিকার’ ও ‘কিয়াম’ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের নিকটবর্তী যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। ইরাক বা সিরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এক বড় আতঙ্ক।

২. মাঝারি পাল্লার কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব: ইরানের আসল শক্তি হলো ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘সেজ্জিল’ ও ‘শাহাব-৩’ ক্ষেপণাস্ত্র। এই মিসাইলগুলোর পাল্লার মধ্যে কেবল পুরো ইসরায়েলই নয়, বরং কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত। ফলে ইরান চাইলে ঘরে বসেই পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন কৌশল: রাডার ফাঁকি দেওয়ার নতুন যুদ্ধবিদ্যা

ইরান কেবল সরাসরি মিসাইল হামলায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare)-এ পারদর্শী হয়ে উঠেছে। রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘সুমার’ ও ‘পাভেহ’ ক্রুজ মিসাইলগুলো মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে, যা শনাক্ত করা প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কঠিন।

পাশাপাশি, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তেহরানের বিশেষ কৌশল হলো—প্রথমে ঝাঁকে ঝাঁকে সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর ‘আয়রন ডোম’ বা ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত করে তোলা। যখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মিসাইলগুলো ড্রোন ঠেকাতে নিঃশেষ হয়ে যায়, তখনই ইরান তাদের মূল শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করে। এই সমন্বিত আক্রমণ পদ্ধতি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এক ভয়াবহ কার্যকরী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ও হাইপারসনিক প্রযুক্তির উত্থান

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ইরান গত কয়েক দশকে তাদের পাহাড়ের নিচে এবং মাটির গভীরে শত শত ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র শহর গড়ে তুলেছে। এই সুরক্ষিত ঘাঁটিগুলো অত্যাধুনিক বিমান হামলায় বা ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা দিয়ে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এখান থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা সম্ভব, যা তেহরানের দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতা (Second Strike Capability) নিশ্চিত করে।

ইরানের সামরিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক মিসাইল। হাইপারসনিক প্রযুক্তির মিসাইলগুলো তাদের গতি ও চলনক্ষমতার কারণে বর্তমান বিশ্বের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েই শতভাগ ঠেকানো সম্ভব নয়। এটি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করেছে।

হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব

ইরানের সামরিক কৌশলের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ইতিমধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (IRGC) দাবি করেছে যে, তারা হরমুজ প্রণালির কাছে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে সফল হামলা চালিয়েছে।

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগামী গানবোটের মাধ্যমে এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ইরানের হাতে রয়েছে। যদি এই রুটটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি কেবল একটি সামরিক হুমকি নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্ত্রও বটে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে জয় নিশ্চিত করা কঠিন। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো সত্ত্বেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং তাদের প্রকৌশলীদের কারিগরি জ্ঞান এখনো অটুট। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল যদি মনে করে কেবল বিমান হামলার মাধ্যমেই ইরানকে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব, তবে তা হবে এক বড় ভুল হিসাব। ইরানের এই বিচিত্র ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তি প্রমাণ করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া যেকোনো পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে—তেহরানের এই ‘আগুনের বৃষ্টি’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে।

আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যর্থ: ট্রাম্পের সামনে এখন কোন পথ? যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে বিশ্ববাজা

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন