লেবাননে ইসরায়েলি তাণ্ডব: হাসপাতাল বিধ্বস্ত, ধ্বংসের মুখে ঐতিহাসিক জনপদ!

Image 49

লেবাননের ঐতিহাসিক ও উপকূলীয় শহর টায়ার (Tyre) এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় ধ্বংসলীলার সাক্ষী। গত ২৪ ঘণ্টায় দফায় দফায় বিমান ও ড্রোন হামলায় ইউনেস্কো স্বীকৃত এই প্রাচীন শহরটির জনজীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বিশেষ করে একটি জনাকীর্ণ হাসপাতালের সন্নিকটে শক্তিশালী বোমা বর্ষণে অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন এবং চিকিৎসা অবকাঠামোটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের এই নতুন মোড় লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

হাসপাতাল ও বন্দরে ধ্বংসযজ্ঞ: ভেঙে পড়ছে চিকিৎসাব্যবস্থা

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র 'লেবানিজ ইতালিয়ান হসপিটাল'-এর পাশের দুটি বহুতল ভবন ইসরায়েলি বিমান হামলায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, হাসপাতালের জানালার কাঁচ চুরমার হয়ে গেছে এবং ফলস সিলিং ধসে পড়েছে।

তবে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম সাহসিকতার সাথে সেবা চালু রাখার ঘোষণা দিয়েছে। হামলার প্রভাব কেবল স্থলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; টায়ারের ঐতিহাসিক সমুদ্রবন্দরেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। এতে বেশ কিছু মাছ ধরার নৌকা ও বাণিজ্যিক জলযান ধ্বংস হয়েছে এবং অন্তত একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এই বন্দর ধ্বংসের ফলে দেশটির খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।

বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ

শহরটির উত্তর উপকণ্ঠে ড্রোন হামলায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ক্রমাগত এলাকা ছাড়ার কঠোর নির্দেশ (Forced Displacement Order) দেওয়ায় টায়ার শহরটি এখন কার্যত জনশূন্য হওয়ার পথে। কয়েক সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ পালালেও এখনো প্রায় ২০ হাজার মানুষ সেখানে আটকা পড়ে আছেন। এদের অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে আসা শরণার্থী, যারা আগে থেকেই ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন তাদের যাওয়ার মতো আর কোনো নিরাপদ জায়গা অবশিষ্ট নেই।

অবকাঠামো ধ্বংসের নীল নকশা: একটি অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড এখন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। আইতা আল-শাব এবং রামিয়াহসহ বেশ কিছু গ্রামে ডিনামাইট দিয়ে বসতবাড়ি উড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর যাতায়াত ও অবস্থান বন্ধের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। তবে মাশঘারা ও সামার সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলোতে বোমা হামলা চালিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘একটি অঞ্চলকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ করার অপচেষ্টা’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: দীর্ঘমেয়াদী দখলদারিত্বের পদধ্বনি?

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ হেইকো উইমেন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করা ইসরায়েলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা আমাদের চোখের সামনে একটি অনির্দিষ্টকালের দখলদারিত্বের বিবর্তন দেখছি।" উইমেনের মতে, হিজবুল্লাহর সামাজিক ও রাজনৈতিক শেকড় অনেক গভীরে, যা কেবল বোমাবর্ষণ করে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়; বরং এই আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহ প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়
গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পরিসংখ্যন এখন আঁতকে ওঠার মতো। লেবাননের সরকারি তথ্য অনুযায়ী:

নিহতের সংখ্যা: এখন পর্যন্ত ১,৩৬৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

আহতের সংখ্যা: ৪,১৩৮ জনেরও বেশি মানুষ পঙ্গুত্ব বা গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন।

বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা: ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজ দেশেই যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন।

টায়ারের ধ্বংসস্তূপ আর হাসপাতালের ধসে পড়া সিলিং আজ লেবাননের আর্তনাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের নামে বেসামরিক অবকাঠামো এবং ঐতিহাসিক বন্দর ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হলেও মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রান্তরে যেন কোনো নিয়মই কাজ করছে না। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে লেবাননের এই প্রাচীন জনপদগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। লাশের মিছিল আর বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস প্রমাণ করছে যে, এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই; বরং এটি একটি আস্ত সভ্যতাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ: অস্ত্র সমর্পণের চূড়ান্ত নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন