বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার বিষয়ে নজিরবিহীন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের পক্ষ থেকে জলপথে এক প্রকার ‘অঘোষিত অবরোধ’ এবং জাহাজ চলাচলের ওপর অনৈতিক ‘টোল’ আদায়ের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, তেহরান রাজি থাকুক বা না থাকুক, খুব শীঘ্রই এই কৌশলগত নৌপথ আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ওয়াশিংটনের এই অনড় অবস্থান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: "সমুদ্রপথে চাঁদাবাজি চলবে না"
সম্প্রতি মেরিল্যান্ডে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ইরানের ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ চলাচলের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের যে ফন্দি এঁটেছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং ওয়াশিংটন এটি কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।
ট্রাম্প দৃঢ়তার সাথে বলেন, "আমরা উপসাগরীয় অঞ্চলকে উন্মুক্ত করবই। অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও এই কাজে আমাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত। এটি হয়তো খুব সহজ হবে না, তবে আমরা এটি দ্রুতই করতে যাচ্ছি।" তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হলেও যুক্তরাষ্ট্র নৌপথের স্বাধীনতা রক্ষা করবে।
শান্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু: পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণই মূল শর্ত
পাকিস্তানের মাটিতে যখন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা একটি ঐতিহাসিক চুক্তির লক্ষ্যে এক টেবিলে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তির মূল শর্তটি আবারও বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেকোনো শান্তি চুক্তির ৯৯ শতাংশই নির্ভর করছে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের ওপর। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসে, তবে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান সংকট "স্বয়ংক্রিয়ভাবে" মিটে যাবে। তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প এই পারমাণবিক ইস্যুকেই প্রধান দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
যুদ্ধবিরতি কি কেবল কাগজে-কলমে? বাস্তবচিত্র বেশ উদ্বেগজনক
গত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও হরমুজ প্রণালীর বাস্তব চিত্র এবং পরিসংখ্যান বেশ হতাশাজনক। তথাকথিত এই বিরতি চলাকালীন সময়েও সমুদ্রপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরু হতে পারেনি।
১. জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা: যুদ্ধের আগে এই পথে দৈনিক গড়ে ১৩৫টি জাহাজ যাতায়াত করত। কিন্তু লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে মাত্র ২২টি জাহাজ এই প্রণালী পার হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছে।
২. আটকা পড়া বাণিজ্যিক নৌবহর: বর্তমানে ৩২৫টি তেলের ট্যাঙ্কারসহ প্রায় ৬০০-এর বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। এই অচলাবস্থা বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহে বড় ধরণের সংকট তৈরি করছে।
৩. ইরানের ‘দ্বাররক্ষী’ ভূমিকা: বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান বর্তমানে জলপথে ‘গেটকিপার’ বা দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করছে। তারা কেবল নিজেদের মিত্র দেশ এবং মানবিক সাহায্যের জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি।
এক নজরে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর হরমুজ প্রণালীর প্রভাব অপরিসীম, যা নিচের পয়েন্টগুলো থেকে স্পষ্ট হয়:
১. জ্বালানি নিরাপত্তা: বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
২. ভৌগোলিক অবস্থান: এটি পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী একমাত্র জলপথ, যার নিয়ন্ত্রণ থাকা মানে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকা।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাব: এই পথটি মাত্র কয়েক দিনের জন্য বন্ধ থাকলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে উস্কে দেয়।
আলোচনায় জেডি ভ্যান্স: সমাধানের পথ কতদূর?
স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। ইরানের দেওয়া ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ—এই দুই মেরুর মধ্যে সমন্বয় ঘটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও ইরান তাদের নিয়ন্ত্রিত নৌপথে একটি ‘সেফ করিডোর’ বা নিরাপদ চলাচলের পথ তৈরি করেছে, তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথের মতে, এই পথটি ইরান সম্পূর্ণ নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে।
বিশ্বের নজর এখন পাকিস্তানের কূটনৈতিক টেবিল এবং হরমুজ প্রণালীর অশান্ত জলরাশির দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের পর ইরান আলোচনার টেবিলে কতটা নমনীয় হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ট্রাম্পের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক নৌপথের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং ‘সমুদ্রপথে চাঁদাবাজি’ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয় নাকি নতুন কোনো বড় সংঘাতের সূচনা করে, তা সময়ই বলে দেবে।
আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পর ইসলামাবাদে মুখোমুখি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড়
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।