ইরানের নৌ-বন্দর অবরোধ করল ১৫টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ; যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে হরমুজ প্রণালি

Image 66

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং পরবর্তী দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার থেকে কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ 'হরমুজ প্রণালি'তে কঠোর সামরিক অবরোধ শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, এই অভিযানে ১৫টিরও বেশি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সরাসরি অংশ নিচ্ছে, যা এই অঞ্চলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি: "আগে আক্রমণ করলে ধ্বংস অনিবার্য"

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ ঘোষণা করার পাশাপাশি ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এক জরুরি বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অবরোধ চলাকালে ইরানের কোনো জাহাজ যদি মার্কিন নৌবহরের ওপর আগে আক্রমণ করার চেষ্টা করে, তবে সেটিকে সমুদ্রে তলিয়ে দিতে পেন্টাগন দ্বিধা করবে না। এই ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি সরাসরি সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমুদ্রে মাদক পাচারকারীদের দমনের উদাহারণ টেনে আরও বলেন, "সমুদ্রে মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূল করতে আমরা যে ধরনের কঠোর ও লক্ষ্যভেদী পদ্ধতি ব্যবহার করি, ইরানের জাহাজগুলো যদি মার্কিন বাহিনীকে উস্কানি দেয় তবে তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে।" তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন এবার ইরানের নৌ-শক্তিতে বড় ধরণের আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে।

আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলে 'রেড অ্যালার্ট' ও জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা

মার্কিন এই নজিরবিহীন সামরিক অবরোধের ফলে বিশ্বব্যাপী নৌ-বাণিজ্য ও জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরণের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সহযোগী সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, এই অবরোধের ফলে কেবল ইরানের বন্দরগুলোই নয়, বরং পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় নৌ-চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে এই অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন, যা ইতোমধ্যে বিশ্ব শেয়ার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: রণপ্রস্তুতি নিচ্ছে বিপ্লবী গার্ড

তেহরান মার্কিন এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) নৌ শাখা এই অবরোধের কঠোর জবাব দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের সামরিক কমান্ড স্পষ্ট জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির দিকে কোনো বিদেশি যুদ্ধজাহাজের অগ্রসর হওয়াকে যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।

ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, "ইরানের একটি বন্দরও যদি আক্রান্ত হয়, তবে এই অঞ্চলের (পারস্য বা ওমান সাগর) কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।" এটি মূলত এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর বন্দর ও স্থাপনার প্রতি পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরিণতি

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এই সংকট তৈরি হলো। দীর্ঘ ৪০ দিনের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। গত শনিবার কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নৌ-অবরোধের নির্দেশ দেন। ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়াকে এই সংঘাতের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী একনজরে:

১. অবরোধকারী শক্তি: ১৫টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ।

২. অবরোধের স্থান: ইরানের নৌ-বন্দর এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি।

৩. সতর্কতা জারি: ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) কর্তৃক রেড অ্যালার্ট।

৪. যুদ্ধের পটভূমি: ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এবং ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়া।

হরমুজ প্রণালিতে চলমান এই উত্তেজনা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আঞ্চলিক লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। যদি কোনো পক্ষ থেকে একটি ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরণের যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে দেখছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরান কি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথে হাঁটবে নাকি কূটনৈতিক পথে ফিরে আসার শেষ কোনো চেষ্টা করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যর্থ: ট্রাম্পের সামনে এখন কোন পথ?

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন