দড়ি বেয়ে মসজিদে যাওয়া অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান আর নেই

Image 55

চোখের আলো না থাকলেও মনের আলোয় যিনি খুঁজে নিয়েছিলেন জান্নাতের পথ, সেই অদম্য প্রাণপুরুষ আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই।

রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামে নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১২০ বছর।

সোমবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার মুসল্লি অংশ নেন। পরে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

দুর্ঘটনা থেকে অটল সাধনা: এক বিস্ময়কর জীবন

আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন সাধারণ কোনো গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করার এক জীবন্ত মহাকাব্য। আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। সেই সময় তার বয়স ছিল প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই। সাধারণ মানুষের বেলায় এমন বয়সে দৃষ্টি হারানো মানেই জীবনের সমাপ্তি ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু আব্দুর রহমান ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া।

দৃষ্টি হারানোর ছয় বছর পর তিনি তার বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে পবিত্র হজ পালন করেন। কাবা শরিফের আঙিনায় দাঁড়িয়েই তিনি সংকল্প করেছিলেন, বাকি জীবনটা আল্লাহর ঘরের সেবায় কাটিয়ে দেবেন।

নিজ হাতে গড়া মসজিদ ও দড়ি-বাঁশের সেই 'গাইড পথ'

দেশ ফিরে এসে তিনি বসে থাকেননি। নিজের সামান্য ৫ শতাংশ জমির ওপর তৈরি করেন একটি পাকা মসজিদ। কিন্তু দৃষ্টিহীন অবস্থায় বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরের মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তার এই ব্যাকুলতা দেখে সন্তানরা বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে মসজিদের মেহরাব পর্যন্ত দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে একটি গাইড লাইন বা পথ তৈরি করে দেন।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই দড়ি ও বাঁশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আজান দিতে মসজিদে যেতেন। রোদ-বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত—কোনো কিছুই তাকে এই পথ চলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। অন্ধত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার এই পথচলা এলাকার মানুষের কাছে ছিল এক পরম বিস্ময়।

শোকের ছায়া ও শেষ বিদায়

তার মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ বলেন,

"আব্দুর রহমান মোল্লা ছিলেন বড়াইগ্রামের প্রবীণতম অভিভাবক। তার মতো নিষ্ঠাবান ও ধর্মপ্রাণ মানুষ বর্তমান যুগে বিরল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে ইবাদতের পথে বাধা হতে পারে না, তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন।"

তার ছেলে স্কুল শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "বাবা সবসময় বলতেন, চোখ নেই তো কী হয়েছে, অন্তরের চোখে তো আল্লাহকে দেখা যায়। তিনি আমৃত্যু মসজিদের খিদমত করতে চেয়েছিলেন, আল্লাহ তার সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন।"

আব্দুর রহমান মোল্লা হয়তো আজ নেই, কিন্তু তার সেই বাঁশ আর দড়ির পথটি আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে এক মুমিনের অটল বিশ্বাসের। তার এই গল্পটি যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রতিকূলতার মাঝেও ধৈর্য ধরার প্রেরণা জোগাবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন