আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: ২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও সাবেক ভিসিসহ ৩০ জনের সাজা

Image 59

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক এবং আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গেটে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সেই দৃশ্যটি নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ববিবেককে। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন। রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যসহ মোট ৩০ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় পাঠ করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, "আবু সাঈদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সূর্যকে ত্বরান্বিত করেছে।"

পুলিশের দুই সদস্যের মৃত্যুদণ্ড ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাজা

আবু সাঈদকে সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালত পুলিশের দুই সদস্যকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ পেশাদারিত্বের চরম লঙ্ঘন। বর্তমানে এই দুইজনই কারাগারে রয়েছেন।

এছাড়া আরপিএমপির কমান্ডিং অফিসারদের অবহেলার দায়ে সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই বিভূতিভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত এই তিনজনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আদালত মনে করেন, মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা চেইন অফ কমান্ডের বড় ব্যর্থতা।

বেরোবি প্রশাসনের ওপর আদালতের খড়গ: সাবেক ভিসির কারাদণ্ড

এই রায়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সাজা। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব থাকলেও বেরোবি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। আদালত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) মো. হাসিবুর রশীদকে হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন ও দায়িত্বহীনতার দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।

একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার দায়ে গণিত বিভাগের শিক্ষক মো. মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর করে এবং সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে ৫ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরণের সাজা বাংলাদেশে এটিই প্রথম, যা আগামী দিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

পুলিশ কমিশনার ও আরপিএমপি কর্মকর্তাদের দণ্ড

রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) তৎকালীন চেইন অফ কমান্ডের ব্যর্থতা ও দমন-পীড়নের দায়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাজা নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আরপিএমপির তৎকালীন কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক উপকমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন এবং সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। আদালত বলেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঠিক নির্দেশনার অভাবেই রাজপথে এত রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।

ছাত্রলীগ নেতাদের কঠোর শাস্তি ও পলাতক আসামিরা

আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নেপথ্যে থাকা বেরোবি ছাত্রলীগের সাবেক ৮ জন নেতাকর্মীকেও আইনের আওতায় এনেছেন ট্রাইব্যুনাল। বেরোবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বি ও আখতার হোসেনসহ বাকিদের ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ নেতাদের প্রায় সবাই বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখা হয়েছে।

মানবিক দিক ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

আইনি কঠোরতার পাশাপাশি আদালত মানবিক বিচারবোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বেরোবি-র চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজের মানবিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁর হাজতবাসকালীন সময়কে সাজা হিসেবে গণ্য করে আদালত তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। এই রায় শুধুমাত্র একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তঋণ পরিশোধের পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার এই রায় বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নিরস্ত্র আন্দোলনকারীর বুকে গুলি চালানো যে চরম অপরাধ, এই রায়ের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত হলো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম বড় কোনো হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচার। দেশের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আশা করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে শহীদ আবু সাঈদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে।

আরও পড়ুন: বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ, ৭৫% কমবে নগদ টাকার ব্যবহার

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন