বিচার বিভাগ ও গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী বিল আনছে সরকার: সংসদে ১৬ অধ্যাদেশ বাতিলের নেপথ্য কারণ

Image 65

দেশের বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং গুম প্রতিরোধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বর্তমানে রহিত হলেও, সরকার জানিয়েছে এটি কোনো পিছুটান নয়। বরং অংশীজনদের (Stakeholders) সাথে বিস্তারিত আলোচনার ভিত্তিতে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নতুন বিল দ্রুতই জাতীয় সংসদে তোলা হবে।

রোববার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারের এই অবস্থান পরিষ্কার করেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তড়িঘড়ি করে অসম্পূর্ণ আইন প্রণয়নের চেয়ে জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি কাঠামো তৈরি করাই এখনকার মূল লক্ষ্য।

১৬টি অধ্যাদেশ ও বর্তমান আইনি পরিস্থিতির রূপরেখা

পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১১০টি অধ্যাদেশ ইতিমধ্যে নবগঠিত সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ও আইনে পরিণত হয়েছে। তবে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমা ১০ এপ্রিলের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে পেশ না করায় সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো:

১. গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত বিশেষ অধ্যাদেশ।

২. দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ।

৩. পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।

৪. গণভোট এবং তথ্য অধিকার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিলসমূহ।

আইনি অস্পষ্টতা ও বিলম্বে সরকারের ব্যাখ্যা

সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, "আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় বাদ দিচ্ছি না। বরং তড়িঘড়ি করে অসম্পূর্ণ আইন পাসের চেয়ে প্রতিটি ধারা যাচাই-বাছাই করে একটি স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন করতে চাই, যা ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি করবে না।"

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিশেষ করে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, আগের অধ্যাদেশে কিছু ভাষাগত ও পদ্ধতিগত অস্পষ্টতা ছিল, যা ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারত। তাই আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী এবং অংশীজনদের নিয়ে একটি বড় ধরণের পরামর্শ সভা বা সেমিনার করা হবে। এরপর সবার মতামতের ভিত্তিতে সংশোধিত বিলগুলো সংসদে পুনরায় উত্থাপন করা হবে।

বিচার বিভাগের ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আমরা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই, তবে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বয় (Harmonious Co-operation) থাকা জরুরি।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন আনা হবে যা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ বয়ে আনবে। বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনাই হবে এই নতুন বিলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সরকারের এই আশ্বাস বিচার বিভাগের সংস্কারপ্রত্যাশী মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

রাজনৈতিক উত্তাপ ও বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া

গুম ও পুলিশ কমিশনের মতো সংবেদনশীল অধ্যাদেশগুলো সময়মতো সংসদে না তোলায় গত শুক্রবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল প্রধান বিরোধী দল। বিরোধী দলের অভিযোগ ছিল, সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কাজগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে সরকার এই ওয়াকআউটকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে আখ্যা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, আগামী অধিবেশনে সব দাবি পূরণ করা হবে এবং কোনো মৌলিক সংস্কারই থেমে থাকবে না। সরকার স্পষ্ট করেছে যে, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতি দমন তাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ। সরকারের এই নতুন বিল আনার প্রতিশ্রুতি যদি সঠিক সময়ে এবং যথাযথ অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আইনি শূন্যতা এড়াতে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে এই ১৬টি অধ্যাদেশের বিল আকারে প্রত্যাবর্তন এখন সময়ের দাবি। বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে দেশের সচেতন সমাজ এখন মে মাসের সেই পরামর্শ সভা এবং সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের দিকে তাকিয়ে আছে।

আরও পড়ুন: জুলাই বিপ্লব ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি: রাজু ভাস্কর্যে অনশনরত শিক্ষার্থীদের পাশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

 

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন