মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সংঘাত এখন কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নিতে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহতের পর যখন পুরো বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে চলমান এই সামরিক অভিযান কেবল কয়েক দিনের নয়, বরং তা অন্তত চার সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে দীর্ঘায়িত হতে পারে। ওয়াশিংটনের এই নতুন অবস্থান প্রমাণ করছে যে, পেন্টাগন এবার কেবল ইরানি নেতৃত্বকে নির্মূল নয়, বরং দেশটির সামগ্রিক সামরিক কাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য ও অভিযানের ব্যাপ্তি: কেন এই দীর্ঘ সময়সীমা?
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকা কৌশলগত কারণগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ইরান আয়তনের দিক থেকে একটি বিশাল রাষ্ট্র এবং এর সামরিক অবকাঠামো অত্যন্ত সুবিন্যস্ত। আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সামরিক অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করতে চার সপ্তাহ বা তার কাছাকাছি সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।”
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা শুরুতে এই অভিযানটি মাত্র কয়েক দিন চলার কথা বললেও, বর্তমানে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তা কয়েক সপ্তাহব্যাপী চালিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে অবস্থিত গোপন মিসাইল ঘাঁটি এবং মাটির গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই বাড়তি সময় হাতে রাখতে চাইছে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘রেড অ্যালার্ট’
মার্কিন এই সর্বাত্মক অভিযানের জবাবে ইরান থেকে এসেছে কঠোর প্রতিরোধের বার্তা। তেহরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছেন, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (IRGC) ইতিমধ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই চার সপ্তাহ কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্যও হবে ইতিহাসের দীর্ঘতম দুঃস্বপ্ন।
এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। যদি এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী চার সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার এবং নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আকস্মিক হামলা ও পেন্টাগনের স্বীকারোক্তি: গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি নতুন কৌশল?
একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যে পেন্টাগন দেশটির কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান প্রথম আঘাত করবে—এমন কোনো আগাম সংকেত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না। অর্থাৎ, এটি কোনো আত্মরক্ষামূলক লড়াই নয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক এবং সুপরিকল্পিত হামলার মধ্য দিয়েই এই নজিরবিহীন সংকটের সূত্রপাত হয়েছে।
পেন্টাগনের এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। অনেক দেশই মার্কিন এই অগ্রিম হামলাকে (Pre-emptive Strike) আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। তবে হোয়াইট হাউস দাবি করছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তাদের হাতে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
সংঘাতের নতুন সমীকরণ: কী ঘটতে যাচ্ছে আগামী কয়েক দিনে?
ট্রাম্পের এই এক মাসের ‘ডেডলাইন’ এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে তা আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আগামী চার সপ্তাহে ইরানের আকাশ ও স্থলভাগে কী পরিমাণ ধ্বংসলীলা চলবে এবং তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরান কোন তুরুপের তাস ব্যবহার করে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো পৃথিবী।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা এখন সুদূরপরাহত। চার সপ্তাহের এই সামরিক অভিযান কেবল একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব বদলের চেষ্টা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে—এই এক মাস কি ইরানের জন্য ধ্বংসের কাল হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন চোরাবালিতে আটকা পড়বে? তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটুকু নিশ্চিত যে, ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী এক মাস পার করতে যাচ্ছে পৃথিবী।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে ইরান: ইতিহাসের দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউনে ধ্বংসের মুখে জনজীবন!
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।