ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে ইরান: ইতিহাসের দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউনে ধ্বংসের মুখে জনজীবন!

Image 53

ইরান বর্তমানে এক অভূতপূর্ব এবং শ্বাসরুদ্ধকর 'ডিজিটাল অন্ধকার' যুগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে যে ইন্টারনেট শাটডাউন চলছে, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং কঠোরতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে যখন বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন একটি উন্নত অবকাঠামোর দেশকে বহির্জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সাথে ইরানের সংযোগ এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ বললেই চলে।

নেটওয়ার্কের পতন: এক ভয়াবহ পরিসংখ্যানের চিত্র

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা NetBlocks-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরানের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ প্রাক-যুদ্ধ অবস্থার তুলনায় মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানের সাধারণ মানুষ বছরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। এই দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউট কেবল যোগাযোগের মাধ্যমকে নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকেই ভেঙে দিচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ ইন্ট্রানেট বনাম বৈশ্বিক ইন্টারনেট: এক সীমাবদ্ধ গণ্ডি

বর্তমানে ইরানিরা কেবল রাষ্ট্র-পরিচালিত একটি সীমিত গণ্ডির 'ইন্ট্রানেট' বা অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারছেন। এর মাধ্যমে শুধুমাত্র সরকারি অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল এবং কিছু স্থানীয় মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করা সম্ভব। নেটব্লকস জানিয়েছে, এর আগে সুদান বা কাশ্মীরে দীর্ঘ ব্ল্যাকআউট দেখা গেলেও, একটি শক্তিশালী টেলিকম অবকাঠামোর দেশকে এভাবে পুরোপুরি অফলাইনে পাঠিয়ে দেওয়ার নজির আর নেই। এর ফলে নাগরিকরা বৈশ্বিক তথ্য প্রবাহ থেকে যেমন দূরে সরে গেছেন, তেমনি যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করার ক্ষমতাও হারিয়েছেন।

ধুঁকছে অর্থনীতি, বাড়ছে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি

ইন্টারনেট না থাকায় দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি কার্যত ধুলোয় মিশে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে:

১. গণছাঁটাইয়ের হিড়িক: তেহরানের পার্শ্ববর্তী এলাকা কারাজের বাসিন্দা কামরান জানান, "জানুয়ারি মাসের ছাঁটাইয়ে চাকরিটা কোনোমতে টিকে থাকলেও এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি।" তাঁর মতো হাজার হাজার আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং পেশার কর্মী এখন কর্মহীন।

২. অস্থায়ী চুক্তি ও বেতন বৈষম্য: অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ছাঁটাই না করে মাত্র তিন মাসের চুক্তিতে নামমাত্র বেতনে কাজ করাচ্ছে, যা শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

৩. অবকাঠামো ধ্বংসের প্রভাব: ইন্টারনেট সংকটের পাশাপাশি বোমা হামলায় গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়েছে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ডিজিটাল ট্র্যাকিংহীন হয়ে পড়ায় বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।

'ইন্টারনেট প্রো': ডিজিটাল বৈষম্যের নতুন সামাজিক রূপ

সবাই বিচ্ছিন্ন থাকলেও ইরানের সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারকার্যের সাথে জড়িতদের জন্য বিশেষ 'হোয়াইটলিস্ট' বা অনুমোদিত তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট এখন এক মহার্ঘ্য বিলাসিতা। সরকার এখন 'ইন্টারনেট প্রো' নামে একটি বিশেষ স্তরবিন্যস্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় সাধারণ প্যাকেজের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ইন্টারনেট বিক্রি করা হবে, যা কেবল বিত্তবান ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাগালের মধ্যে থাকবে। এটি ইরানে এক নতুন ধরণের ডিজিটাল বৈষম্য সৃষ্টি করছে।

যুদ্ধের ছায়ায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: নাগরিকদের ক্ষোভ

একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অবকাঠামো ধ্বংসের নিয়মিত হুমকি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস—সব মিলিয়ে ইরানিরা এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। তেহরানের এক বাসিন্দা ক্ষোভের সাথে বলেন, "যেখানে চাঁদ থেকে লাইভ ভিডিও দেখা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে আমরা গুগলে একটা সাধারণ সার্চ পর্যন্ত করতে পারছি না।"

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসন ইন্টারনেট উন্মুক্ত করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং নিরাপত্তার অজুহাতে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।

ইরানের এই ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট কেবল একটি কারিগরি সংকট নয়, এটি একটি মানবাধিকার বিপর্যয়। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন হলেও ইরানিরা দীর্ঘ সময় ধরে সেই অভাবনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধের দামামা এবং অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি এই 'তথ্যের যুদ্ধ' ইরানকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি দ্রুত হস্তপেক্ষ না করে, তবে ইতিহাসের এই দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউন একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার ডিজিটাল মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিতে পারে।

আরও পড়ুন: সোমবারেই কি শুরু হবে মহাযুদ্ধ? ইরানকে ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি: ‘হরমুজ না খুললে নামবে নরক’

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন