মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরান ও ইসরায়েল এখন সরাসরি একে অপরের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডে আঘাত হানার খেলায় মেতেছে। গত বুধবার ইসরায়েলের অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র এবং বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল হাইফা তেল শোধনাগারে সরাসরি মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, এটি তাদের 'সাউথ পার্স' গ্যাসক্ষেত্রে চালানো ইসরায়েলি বিমান হামলার একটি যথাযথ ও শক্তিশালী পাল্টা জবাব। এই নজিরবিহীন হামলার পর পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী ‘জ্বালানি যুদ্ধের’ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধস নামাতে পারে।
হাইফার বর্তমান পরিস্থিতি: বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ও অবকাঠামো ঝুঁকি
ইসরায়েলি জ্বালানি মন্ত্রী এলি কোহেন বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছেন যে, উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফার ‘অয়েল রিফাইনারিজ লিমিটেড’ (ORL) লক্ষ্য করে এই নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পরপরই শোধনাগার সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যথারীতি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আড়াল করার চেষ্টা করেছে।
মন্ত্রী কোহেন এক বিবৃতিতে বলেন, "উত্তর ইসরায়েলের বিদ্যুৎ গ্রিডে যে ক্ষতি হয়েছে তা স্থানীয় এবং গুরুতর নয়। আমাদের অবকাঠামো সাইটগুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়েনি।" যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে শোধনাগার এলাকা থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা প্রমাণ করে যে ইরানের মিসাইল প্রযুক্তি এখন ইসরায়েলের যেকোনো প্রান্তের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি: "আর কোনো সংযম নয়"
ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, হাইফার পাশাপাশি দক্ষিণের আশদোদ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও তারা লক্ষ্যভেদ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "আমাদের জাতীয় অবকাঠামোতে যদি পুনরায় আঘাত করা হয়, তবে ইরান আর কোনো 'সংযত' আচরণ (ZERO restraint) দেখাবে না।" তেহরানের এই ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। ইরানের দাবি, তারা কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাকেই লক্ষ্যবস্তু করছে, তবে ইসরায়েল বেসামরিক এলাকায় হামলা চালালে তারা আরও কঠোর হবে।
উত্তপ্ত সীমান্ত ও ক্রমবর্ধমান মানবিক বিপর্যয়
তেহরান ও তেল আবিবের এই সরাসরি সংঘাতের সমান্তরালে উত্তর সীমান্তেও উত্তেজনা চরম সীমায় পৌঁছেছে। হাইফায় হামলার দিনেই উত্তর ইসরায়েলের কিরিয়াত শমোনা এলাকায় লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় অন্তত ৪ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি উদ্ধারকারী সংস্থার তথ্যমতে, আহতদের মধ্যে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর থেকেই এই সংঘাত এক নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত রূপ নেয়। মার্চ মাসের শুরু থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ইতিমধ্যে ১,০০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খামেনেইর মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং পুরো অঞ্চলে প্রতিশোধের এক আগ্নেয়গিরি তৈরি করেছে।
সংঘাতের নতুন সমীকরণ: বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েল এখন একে অপরের তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকে ধ্বংস করার যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করবে। যদি এই জ্বালানি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করলেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনার পারদ কেবল বেড়েই চলেছে।
হাইফা তেল শোধনাগারে হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি ইসরায়েলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে ইরানের একটি বড় আঘাত। ইসরায়েল যদি এই হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরানের জ্বালানি খাতে পুনরায় বড় ধরণের হামলা চালায়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হতে পারে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে যে, এই সংঘাত কি আলোচনার টেবিলে থামবে, নাকি এক সর্বগ্রাসী যুদ্ধে রূপ নেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
আরও পড়ুন: ইরানে সামরিক অভিযানের মেয়াদ নিয়ে ট্রাম্পের বড় ঘোষণা!
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।