মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর কেবল হুমকি-ধমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দেওয়া এক নতুন আল্টিমেটামে স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী সোমবারের মধ্যে যদি তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না করে, তবে দেশটির ওপর "ভয়াবহ বিপর্যয়" নেমে আসবে। ট্রাম্পের ভাষায়, "All hell will rain down"—যা মূলত একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রচ্ছন্ন ঘোষণা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শনিবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই কড়া হুঁশিয়ারি দেন। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন পুরো বিশ্ব জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে।
নিখোঁজ পাইলট ও জটিল উদ্ধার অভিযান: সংঘাতের নতুন মাত্রা
ট্রাম্পের এই কঠোর হুমকির নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর সামরিক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তাদের একজন নিখোঁজ পাইলটকে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত কয়েক দিনে ইরানের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাতে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। সেই বিমানের পাইলটকে উদ্ধারে চালানো অভিযানে নতুন করে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিখোঁজ পাইলটকে খুঁজতে যাওয়া আরও দুটি মার্কিন উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারকেও ইরানি বাহিনী গুলি করে নামিয়েছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, হেলিকপ্টারের ক্রুদের উদ্ধার করা সম্ভব হলেও মূল পাইলটের কোনো খোঁজ এখনো মেলেনি। এই ঘটনাটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর আত্মমর্যাদায় বড় আঘাত হেনেছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করছে।
বি-৫২ বোমারু বিমান ও ট্রাম্পের কৌশলগত ভুল হিসাব?
বর্তমান এই সংঘাত মার্কিন সামরিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, মার্কিন বাহিনীর নিখুঁত হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। সেই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই ওয়াশিংটন বিশাল মারণাস্ত্র বহনে সক্ষম B-52 স্ট্রাটফোর্ট্রেস বোমারু বিমান মোতায়েন করে।
কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে, ট্রাম্পের সেই দাবি সঠিক ছিল না। ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত সক্রিয় এবং মার্কিন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের জন্য বিপজ্জনক। এর ফলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিশাল আকৃতির এই বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো এখন ইরানি মিসাইলের সামনে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বোমারু বিমানগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক। ট্রাম্পের ‘ভুল হিসাব’ এখন মার্কিন বাহিনীকে এক কঠিন প্রতিরক্ষা সংকটে ফেলে দিয়েছে।
বিশ্বের নজর এখন সোমবারে: কেন গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালী?
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই রুটটি বন্ধ থাকা মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধাক্কা লাগা এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া। ট্রাম্পের দেওয়া সোমবারের সেই চূড়ান্ত সময়সীমা পার হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী ধরণের সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং ইরান তার পাল্টা জবাব কীভাবে দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব:
১. অর্থনৈতিক ঝুঁকি: হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে।
২. সামরিক উত্তেজনা: বি-৫২ বোমারু বিমান এবং ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার লড়াই।
৩. মানবিক সংকট: নিখোঁজ মার্কিন পাইলট এবং উদ্ধার অভিযানে প্রাণহানির আশঙ্কা।
আগামী সোমবার কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি ভাগ্যনির্ধারক দিন হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আল্টিমেটাম যদি ইরান উপেক্ষা করে, তবে কি সত্যিই "নরক" নেমে আসবে পারস্য উপসাগরের উপকূলে? নাকি শেষ মুহূর্তে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা এই মহাযুদ্ধের দাবানল থামিয়ে দেবে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে দেখছে যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরান কি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথে হাঁটবে নাকি শান্তির শেষ সুযোগটি গ্রহণ করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলের হাইফা তেল শোধনাগারে ইরানের মিসাইল হামলা
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।