মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন ভয়াবহ যুদ্ধের মেঘে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নাটকীয় ও বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতির খবর বিশ্ববাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। তবে এই শান্তি প্রচেষ্টায় শুরুতেই জল ঢেলে দিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের সমঝোতা হলেও লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান একচুলও থামবে না। নেতানিয়াহুর এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে এক নতুন এবং আরও জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
নেতানিয়াহুর অবস্থান: লেবানন কেন যুদ্ধবিরতির বাইরে?
বুধবার (৮ এপ্রিল) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক কড়া বার্তায় নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-নীতিকে পূর্ণ সমর্থন করে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি বন্ধে মার্কিন পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয়। তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী, দুই সপ্তাহের এই বিশেষ যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে 'লেবানন ফ্রন্ট' কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত নয়।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। কারণ এর মাত্র কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছিলেন যে, ইসলামাবাদে হওয়া এই সমঝোতা লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের জন্য কার্যকর হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই আলোচনার টেবিল থেকে লেবানন ইস্যুটি কৌশলে বাদ রাখা হয়েছে?
সংঘাতের মূলে: ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হত্যাকাণ্ড ও প্রতিশোধের আগুন
বর্তমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ইসরায়েলি এক ভয়াবহ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর প্রতিশোধ হিসেবে ২ মার্চ থেকে তেহরান-পন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর বৃষ্টির মতো রকেট ও মিসাইল হামলা শুরু করে। মূলত এরপর থেকেই লেবানন সরাসরি এই ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ইসরায়েলও লেবাননের ভেতরে ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে।
লেবাননে মানবিক বিপর্যয়: পরিসংখ্যান যা বলছে
লেবানিজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক মাসে ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননের আর্থ-সামাজিক ও মানবিক চিত্র ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে নিচের পরিসংখ্যানগুলো যথেষ্ট:
১. নিহতের সংখ্যা: মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে।
২. বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা: প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
৩. স্থল অভিযান: দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনী ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে। তারা সীমান্তে একটি শক্তিশালী 'বাফার জোন' বা নিরাপদ অঞ্চল দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষণ: ইরানের হাতেই কি লেবাননের চাবিকাঠি?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ এখন সরাসরি ইরানের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। লেবাননের বর্তমান সরকার কার্যত ক্ষমতাহীন; তারা চাইলেও হিজবুল্লাহকে থামানোর সক্ষমতা রাখছে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলের দাবি—যতক্ষণ না উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ লেবাননের মাটিতে তাদের ‘অপারেশন’ অব্যাহত থাকবে।
আল জাজিরার বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই যুদ্ধবিরতির সুফল পেতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই হিজবুল্লাহর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু তেহরান কি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রক্সি বাহিনীকে এই মুহূর্তে নিষ্ক্রিয় করবে?
আগামী ১৪ দিনের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সময় কেনা নাকি স্থায়ী শান্তির পথ—তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। নেতানিয়াহুর ঘোষণার পর এটি স্পষ্ট যে, তেহরান ও ওয়াশিংটন হাত মেলালেও লেবাননের আকাশ থেকে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গর্জন এখনই থামছে না। ইরান কি আলোচনার টেবিলে হিজবুল্লাহকে শান্ত করার কোনো গ্যারান্টি দেবে? নাকি লেবানন হবে এই বড় যুদ্ধের নতুন মৃত্যুপুরী? বিশ্ব সম্প্রদায় এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
আরও পড়ুন: ইরান কি তবে ধ্বংসের পথে? ট্রাম্পের ‘সভ্যতা’ বিলীনের হুমকি ও পরমাণু যুদ্ধের বিশ্ব কাঁপানো আতঙ্ক
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।