দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে এবং মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন নবনিযুক্ত আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। সোমবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেন।
মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি রোধে বিশেষ গুরুত্ব
আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর প্রথম বড় ধরণের সমন্বয় সভা। সভায় আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন যে, মহাসড়ক হলো দেশের অর্থনীতির ধমনী। এখানে পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি কিংবা সাধারণ যাত্রীদের ছিনতাই ও ডাকাতির শিকার হওয়ার কোনো ঘটনা বরদাশত করা হবে না।
তিনি হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, "মহাসড়কে অপরাধ দমনে কোনো ধরণের শিথিলতা দেখানো যাবে না। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে অপরাধীদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে।" বিশেষ করে রাতের বেলা টহল পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো এবং সন্দেহভাজন পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট স্থাপনের ওপর তিনি জোর দেন।
আসন্ন ঈদ যাত্রা ও জনভোগান্তি নিরসন
সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর। প্রতি বছর ঈদের সময় ঘরমুখী মানুষের যাতায়াতে যে চরম ভোগান্তি ও যানজটের সৃষ্টি হয়, তা নিরসনে এখন থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ প্রধান। তিনি বলেন, ঈদে মানুষ যেন নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারে এবং কর্মস্থলে ফিরতে পারে, তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রাস্তা দখল করে অবৈধ হাটবাজার বসানো, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাসের টিকিট কালোবাজারি এবং যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সিন্ডিকেট রুখতে সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেন আইজিপি।
থানা হবে জনসেবার নিরাপদ কেন্দ্র
পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে থানায় আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, পুলিশ জনগণের সেবক, শাসক নয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, থানায় আসা ভুক্তভোগীদের সাথে সদাচরণ করতে হবে এবং তাদের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে শুনতে হবে। আইজিপি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন, "কোনোভাবেই যেন নিরপরাধ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার বা হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে বিভাগীয় পর্যায়ে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই পুলিশের হারানো ভাবমূর্তি পুনরায় উজ্জ্বল করতে হবে।
মাদক ও পেশাদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই
মাদককে দেশের তরুণ সমাজের বড় শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে আইজিপি মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ কর্মকর্তাদের আপসহীন হওয়ার নির্দেশ দেন। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে পুলিশের কোনো স্তরের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির তাঁর বক্তব্যের শেষে সকল পুলিশ সদস্যকে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পুলিশকে হতে হবে মানবিক কিন্তু অপরাধের বিরুদ্ধে বজ্রকঠোর।" দক্ষ ও আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ার লক্ষে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং দ্রুত রেসপন্স সিস্টেম উন্নত করারও নির্দেশনা দেন তিনি।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এই ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই বন্ধ হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে। তবে এই নির্দেশনার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা ও কর্মতৎপরতার ওপর। পুলিশ যদি প্রকৃত অর্থেই জনগণের বন্ধু হয়ে কাজ করতে পারে এবং অপরাধীদের সাথে সব ধরণের সমঝোতা পরিহার করে, তবে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব হবে, এমনটাই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: ২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও সাবেক ভিসিসহ ৩০ জনের সাজা
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।