অবশেষে ধরা পড়লেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেন। দীর্ঘ আত্মগোপন এবং সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পলায়ন করার পরও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) এর জালে আটকা পড়েছেন তাঁরা। শনিবার দিবাগত রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বনগাঁ এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক নতুন গতির সঞ্চার হলো।
যেভাবে ধরা পড়লেন অভিযুক্তরা
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় ওত পেতে ছিলেন গোয়েন্দারা। ফয়সাল ও আলমগীর অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। শনিবার দিবাগত রাতে তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর এসটিএফ অভিযান চালায়। ভারতীয় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে এবং রোববার তাঁদের আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে থাকা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে এটি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও প্রেক্ষাপট
নিহত শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন একজন উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক। তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, ওসমানের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে একটি প্রভাবশালী মহল। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর সরাসরি মদত ও পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। মূলত রাজনৈতিক পথ পরিষ্কার করতেই ওসমান হাদিকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল।
পুরানা পল্টনের সেই রক্তঝরা দুপুর
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর এক মর্মান্তিক হামলার শিকার হন ওসমান হাদি। রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোড এলাকা দিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে পেছন থেকে গুলি চালায়। সরাসরি মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। টানা কয়েকদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ নেতা। এই হত্যাকাণ্ডটি রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে চরম অস্থিরতা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
তদন্তে উঠে আসা মূল অপরাধীদের প্রোফাইল
বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘ তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত কয়েকজনের নাম উঠে আসে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান:
ফয়সাল করিম মাসুদ: হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার বা কিলার। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি নিজেই সরাসরি ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। ফয়সাল ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
আলমগীর হোসেন: ফয়সালের প্রধান সহযোগী। তিনি আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। হত্যাকাণ্ডের সময় ফয়সালকে পালাতে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সরাসরি সহযোগিতা করেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই এই দুই আসামি আত্মগোপনে চলে যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তাঁরা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। তবে দুই দেশের গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী জীবনের পলায়ন পর্বের সমাপ্তি ঘটল।
আইনি প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গ্রেপ্তারকৃত এই দুই আসামিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যেহেতু তাঁরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাই সেখানে অনুপ্রবেশের মামলায় বিচার হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের (Extradition) প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, মূল ঘাতকরা গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীসহ অন্যান্য নেপথ্য কারিগরদের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তারের সংবাদে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা দ্রুততম সময়ে আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। এই গ্রেপ্তারের ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, অপরাধ করে সীমান্ত পেরিয়েও পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধে এই বিচার প্রক্রিয়াটি দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে পুলিশের বিশেষ ‘এস ড্রাইভ’: রাতভর অভিযানে গ্রেপ্তার ৬৫!
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।