চট্টগ্রামে সিএমপির বিশেষ ‘এস ড্রাইভ’: রাতভর সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৬৫, তবে অধরা চন্দনপুরার শ্যুটাররা

Image 3

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর অপরাধ দমনে মধ্যরাতে একযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। ‘সিমালটেনিয়াসলি ড্রাইভ’ বা সংক্ষেপে ‘এস ড্রাইভ’ নামক এই অভিযানে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই ব্যাপক তৎপরতার মধ্যেও চন্দনপুরায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্তরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

মধ্যরাতের চিরুনি অভিযান: কোথায় কী হলো?

রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে নগরের গুরুত্বপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ ১০টি এলাকায় একযোগে এই অভিযান শুরু হয়। সিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের কয়েকশ সদস্য এই বিশেষ অভিযানে অংশ নেন। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ৬৫ জনের মধ্যে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৪১ জন, কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতায় ১২ জন, মাদক মামলায় ৫ জন এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানকালে পুলিশ কিছু দেশীয় অস্ত্র ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের দাবি করেছে। মূলত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমানোই ছিল এই ড্রাইভের প্রাথমিক লক্ষ্য।

কেন এই ‘এস ড্রাইভ’? কৌশল ও প্রেক্ষাপট

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী এই অভিযানের নামকরণ ও কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, ‘এস ড্রাইভ’ বা ‘সিমালটেনিয়াসলি ড্রাইভ’ হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একই সময়ে একাধিক পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের পালানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে অপরাধের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবনে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর জনমনে যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতেই এই বিশাল শক্তির মহড়া বা ‘এস ড্রাইভ’ এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ চাইছে এই বার্তা দিতে যে, অপরাধীদের জন্য চট্টগ্রামের কোনো এলাকা আর নিরাপদ নয়।

ঘোষণা দিয়ে অভিযান: কৌশল নাকি সীমাবদ্ধতা?

সিএমপি এই অভিযান শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে আগাম ঘোষণা দিয়েছিল। সাধারণত অপরাধ দমনে ‘সারপ্রাইজ রেইড’ বা ঝটিকা অভিযান কার্যকর হলেও, ঘোষণা দিয়ে অভিযান চালানো নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছে। নেটিজেনদের একাংশের মতে, আগে থেকে জানিয়ে দিলে মূল অপরাধীরা সতর্ক হয়ে যায় এবং গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ পায়।

তবে পুলিশ এই সমালোচনাকে তাদের বিশেষ ‘কৌশল’ হিসেবেই দাবি করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ঘোষণা দিলে অপরাধীরা আতঙ্কে স্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করে। আর এই স্থানান্তরের সময় তাদের নতুন গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়। যদিও চন্দনপুরায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো উদ্ধারে এখনো কোনো বড় সাফল্য আসেনি, তবে পুলিশ বর্তমানে শহরের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজরদারি ও চিরুনি অভিযান জোরদার করেছে।

কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই দমনে নতুন চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখন এক প্রধান সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এই গ্যাংগুলো পাড়া-মহল্লায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুর্বিষহ করে তুলছে। রোববারের অভিযানে ১২ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলেও নগরবাসীর মতে, এটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই শুধুমাত্র রাতভর অভিযান নয়, বরং এদের মূল উৎপাটনে দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ‘এস ড্রাইভ’ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা সাময়িকভাবে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছে। তবে নগরবাসীর প্রকৃত আস্থা তখনই ফিরে আসবে, যখন স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবনে গুলিবর্ষণের মতো বড় অপরাধের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে। ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের সাফল্যের একটি অংশ হলেও, অপরাধমুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে হলে এই অভিযানকে নিয়মিত এবং আরও বেশি ফলাফলমুখী করতে হবে। পুলিশি তৎপরতা যেন কেবল লোকদেখানো মহড়ায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বন্দরনগরীর সচেতন মানুষ।

আরও পড়ুন: ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইজিপির ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন