ইরান যুদ্ধ: বিপাকে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি কৃষক, অনিশ্চয়তায় খাদ্য নিরাপত্তা

Image 46

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি আর সামরিক উত্তেজনা এখন আর কেবল সুদূর কোনো দেশের রণক্ষেত্রের সংবাদ নয়; এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি কৃষকের দুপুরের খাবারের অনিশ্চয়তা। তেহরান, তেল আবিব কিংবা ওয়াশিংটনের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের প্রভাব হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখন পৌঁছে গেছে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের কৃষিখাত এই সংঘাতের কারণে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। সারের কাঁচামাল ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আসন্ন চাষাবাদের মৌসুম নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

১. হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির সেই রুদ্ধশ্বাস ‘লাইফলাইন’

বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী ‘হরমুজ প্রণালী’। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই জলপথটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান ধমনী বা লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট উত্তোলিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়া তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো এই প্রাকৃতিক গ্যাস।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে সারের কাঁচামাল ও জ্বালানি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে একদিকে যেমন সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে বিকল্প পথে জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।

২. দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতে আঘাত: ভারত থেকে বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। দেশভেদে এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত গভীর:

ভারত: ভারতের প্রায় ৪০ হাজার কোটি (৪০০ বিলিয়ন) ডলারের বিশাল কৃষিখাত এখন ঝুঁকির মুখে। দেশটির প্রয়োজনীয় সার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে সারের অভাবে প্রায় ১০ কোটি কৃষক পরিবারের উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।

পাকিস্তান: পাকিস্তানের জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। দেশটি বিশেষ করে ডিএপি (DAP) সারের জন্য এই সমুদ্রপথের ওপর ২০-২৫ শতাংশ নির্ভরশীল। গ্যাসের দাম বাড়ায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদনও এখন ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ: বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। আমদানিকৃত সারের এক-চতুর্থাংশের বেশি এই সংঘাতপূর্ণ পথ দিয়ে আসে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশের প্রান্তিক চাষিরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

নেপাল: স্থলবেষ্টিত দেশ নেপাল তাদের প্রায় সবটুকু সারের জন্য ভারতের মাধ্যমে আমদানির ওপর নির্ভর করে। ফলে আঞ্চলিক এই সংকটের ঢেউ নেপালের পাহাড়ি কৃষিতে আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।

৩. মাঠপর্যায়ের উদ্বেগ ও সরকারি পদক্ষেপ

সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। ভারত সরকার সারের বিকল্প উৎস হিসেবে অন্যান্য দেশের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ন্যানো ইউরিয়া’ ও প্রাকৃতিক চাষাবাদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাজার তদারকি বা মনিটরিং বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। সারের প্রকৃত অভাব তৈরি হওয়ার আগেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা পর্যাপ্ত সার কিনতে না পেরে জমিতে সারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ফসলের মান ও হেক্টর প্রতি ফলন—উভয়ই কমে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

৪. দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি: খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক অস্থিরতা

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল কৃষকের তাৎক্ষণিক পকেট কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পুরো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি জাতীয় হুমকি।

উৎপাদন হ্রাস: সারের যথাযথ ব্যবহার না হলে ধান, গম ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫-৩০ শতাংশ কম হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি: উৎপাদন কমলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে, যেখানে মানুষের আয়ের একটি বড় অংশই খাবারের পেছনে ব্যয় হয়, সেখানে এই মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

সামাজিক অস্থিরতা: খাদ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট সবসময়ই জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। এই অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ভূ-রাজনীতি আজ দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকার ওপর কালো ছায়া ফেলেছে। সার ও জ্বালানি সংকটের কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই আশঙ্কা কেবল কৃষকদের সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। হাজার মাইল দূরের কামান আর বারুদের গন্ধ এখন বাংলার মাঠের মাটির সুবাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। দ্রুত বিকল্প বাণিজ্যিক পথ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না করলে এই সংকট ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আরও পড়ুন: তেহরানের যুদ্ধ, বাংলার মাঠ: উপসাগরীয় সংকটে বিপাকে দেশের কৃষি ও কৃষক

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন