মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাব এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠগুলোতেও পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের কৃষিখাত এই সংঘাতের কারণে একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি।
সারের কাঁচামাল ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং এদের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকরা আসন্ন চাষাবাদের মৌসুম নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। যে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে সুদূর তেহরানে, তার প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক আঘাত এখন দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ কৃষকদের পকেটে এসে লাগছে।
১. সংকটের কেন্দ্রবিন্দু: হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
বর্তমান এই বৈশ্বিক কৃষি সংকটের প্রধান কারণ হলো ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী ‘হরমুজ প্রণালী’। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই জলপথটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত।
জ্বালানি ও সারের সংযোগ: বিশ্বের মোট উত্তোলিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার (যেমন ইউরিয়া) তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো এই প্রাকৃতিক গ্যাস।
অবরোধের প্রভাব: গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে সারের কাঁচামাল ও জ্বালানি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে একদিকে যেমন সারের আকাল দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
২. দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতে বড় ধরনের আঘাত
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশই তাদের সারের চাহিদার একটি বড় অংশের জন্য এই আমদানিপথের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। দেশভেদে এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত গভীর:
ভারত: ভারতের প্রায় ৪০০ বিলিয়ন (৪০ হাজার কোটি) ডলারের বিশাল কৃষি খাত এখন ঝুঁকির মুখে। দেশটির প্রয়োজনীয় সার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে সারের অভাবে প্রায় ১০ কোটি কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রা ও উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।
পাকিস্তান: পাকিস্তানের জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। দেশটি বিশেষ করে ডিএপি (DAP) সারের জন্য এই সমুদ্রপথের ওপর ২০-২৫ শতাংশ নির্ভরশীল। এছাড়া বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়ায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদনও এখন ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, যা দেশীয় বাজারে সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। এ দেশের কৃষকরা মূলত আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরশীল। আমদানিকৃত সারের প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এই সংঘাতপূর্ণ পথ দিয়ে আসে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশের প্রান্তিক চাষিরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
নেপাল: নেপাল প্রায় তার সবটুকু সারের জন্য ভারতের মাধ্যমে আমদানির ওপর নির্ভর করে। ফলে আঞ্চলিক এই সংকটের প্রভাব নেপালের পাহাড়ি কৃষিতে আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
৩. মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারি পদক্ষেপ
বিভিন্ন দেশের সরকার এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানাচ্ছে। ভারত সরকার সারের বিকল্প উৎস খোঁজা এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ন্যানো ইউরিয়া’ ও প্রাকৃতিক চাষাবাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পাকিস্তান সরকারও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাজার তদারকি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। সারের প্রকৃত অভাব তৈরি হওয়ার আগেই বাজারের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়তে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা পর্যাপ্ত সার কিনতে না পেরে জমিতে সারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ফসলের মান ও উৎপাদন—উভয়ই কমে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৪. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল কৃষকের তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি পুরো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।
উৎপাদন হ্রাস: সারের যথাযথ ব্যবহার না হলে ধান, গম ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হবে।
মূল্যস্ফীতি: উৎপাদন কমলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে, যেখানে মানুষের আয়ের একটি বড় অংশই খাবারের পেছনে ব্যয় হয়, সেখানে এই মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সামাজিক অস্থিরতা: খাদ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা এখন দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার ওপর সরাসরি ছায়া ফেলেছে। সার ও জ্বালানি সংকটের কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই আশঙ্কা কেবল কৃষকদের সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যথাযথ কূটনৈতিক ও বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ঘনীভূত হতে পারে।
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।