তেহরানের যুদ্ধ, বাংলার মাঠ: উপসাগরীয় সংকটে বিপাকে দেশের কৃষি ও কৃষক

Image 47

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি আর সামরিক উত্তেজনা এখন আর কেবল সুদূর কোনো দেশের সংবাদ নয়; এটি এখন বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের দুপুরের খাবারের অনিশ্চয়তা। হাজার মাইল দূরে তেহরান কিংবা ইসরায়েলের আকাশে উড়তে থাকা যুদ্ধবিমানের গর্জন এখন বাংলাদেশের শস্যক্ষেতের নীরব কান্নায় রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দূরদেশের বারুদের গন্ধ এখন বাংলার মাঠের মাটির সুবাসকে ম্লান করে দিচ্ছে।

১. সারের মহাসংকট: আমদানির লাইফলাইন যখন বিচ্ছিন্ন

বাংলাদেশের কৃষিখাত মূলত আমদানিকৃত সারের ওপর দাঁড়িয়ে। ফসলের সঠিক ফলন নিশ্চিতে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সারের বিকল্প নেই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট আমদানিকৃত সারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালীর এই রুট দিয়ে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে এই জলপথটি সামরিক উত্তেজনার কারণে বন্ধ থাকায় সারবাহী জাহাজগুলো মাঝপথে আটকা পড়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হওয়ার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট যুদ্ধের অজুহাতে সারের দাম আকাশচুম্বী করে দিয়েছে। প্রকৃত ঘাটতি বাজারে পূর্ণ মাত্রায় শুরু হওয়ার আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রান্তিক কৃষকের পকেট কাটা হচ্ছে। বর্তমানে সারের জন্য ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও রিক্তহস্তে ফিরছেন কৃষকরা, যা আগামী মৌসুমের চাষাবাদকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

২. উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কৃষকের ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’

বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকরা এমনিতেই নানা প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযুদ্ধ চালান। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি তাদের ওপর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সার ও জ্বালানি তেলের দামের এই অস্থিরতা একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শিকল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

সার তৈরির প্রধান উপাদান এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সার কারখানাগুলো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেচ পাম্প চালানো এবং ট্রাক্টরের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একজন কৃষকের উৎপাদন খরচ যখন ৪০-৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তখন তার বিনিয়োগটি হয়ে পড়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফসল তোলার পর যদি বাজারে সঠিক দাম পাওয়া না যায়, তবে সেই কৃষক ঋণের জালে চিরতরে আটকা পড়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

৩. ফলন বিপর্যয় ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁক

সার হলো ফসলের প্রাণ। সারের অভাবে বা উচ্চমূল্যের কারণে যদি কৃষক জমিতে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে না পারেন, তবে এর ফলাফল হবে ভয়াবহ। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ধান, গম ও ভুট্টার মতো দানাদার জাতীয় ফসলে সঠিক সময়ে সার না দিলে হেক্টর প্রতি ফলন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

শুধু ফলন হ্রাস নয়, সারের অভাবে ফসলের দানাও পুষ্ট হয় না, যা ফসলের গুণগত মান নষ্ট করে। এর ফলে কৃষক বাজারে ফসলের ভালো দাম পান না এবং দেশের সামগ্রিক খাদ্য মজুত হুমকিতে পড়ে। সরকারিভাবে প্রতি বছর যে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, সারের এই আন্তর্জাতিক সংকটে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে দেশ এক দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।

৪. প্রান্তিক কৃষকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিপর্যয়

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের পকেটে টাকা না থাকা মানে গ্রামীণ বাজারের স্থবিরতা। ফলন খারাপ হলে বা উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে কৃষক পরিবারগুলো সবার আগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষুদ্র চাষি এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষ করেন। ফলন বিপর্যয় মানেই এই পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের অভিশাপ। এক শস্যক্ষেতের ব্যর্থতা কেবল একটি মৌসুমের ক্ষতি নয়, বরং একটি পরিবারের কয়েক বছরের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৫. জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ ও মূল্যস্ফীতির হুমকি

কৃষকের এই ব্যক্তিগত ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমলে সরকারকে বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে চড়া দামে চাল ও গম আমদানি করতে হবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। এছাড়া যখন উৎপাদন কম হবে, তখন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের খাদ্য তালিকায় টান পড়বে, যা দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

উপসাগরীয় এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি অশনিসংকেত। হাজার মাইল দূরের কামান আর বারুদের গন্ধ এখন বাংলাদেশের প্রতিটি শস্যক্ষেতের জন্য এক চরম অস্তিত্বের লড়াই। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি সরকার সারের বিকল্প উৎস (যেমন—রাশিয়া, কানাডা বা মরক্কো) থেকে আমদানির তড়িৎ ব্যবস্থা না নেয় এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ সারের ভর্তুকি ঘোষণা না করে, তবে আগামী মৌসুমের ফসল ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।

আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধ: বিপাকে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি কৃষক, অনিশ্চয়তায় খাদ্য নিরাপত্তা

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন