জুলাই বিপ্লবের রক্তস্নাত গণরায়কে নস্যাৎ করতে আদালতকে আবারও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিচার বিভাগকে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানালে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। সোমবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এনসিপি আয়োজিত এক বিভাগীয় ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিচার বিভাগ ও গণরায়ের মর্যাদা রক্ষা ইফতার মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা এবং গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের ভিত্তিতেই এই সরকার গঠিত হয়েছে। জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা ও রায়কে বাতিল করতে বা পাশ কাটিয়ে যেতে যদি আদালতকে ব্যবহার করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ঠিক এই পথেই নিজেদের পতনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা স্পষ্ট দাবি জানাই, কোনো প্রকার আইনি মারপ্যাঁচে যেন জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে খাটো করা না হয়। জনগণের রায়ের ওপর দাঁড়িয়েই নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানই জনরায়ের ঊর্ধ্বে নয়।’
ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রতিরোধ ও স্থানীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গেও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন এই তরুণ সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শক্তির আস্ফালন এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তারা বিভিন্ন ছদ্মবেশে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। যেখানেই ফ্যাসিবাদের তৎপরতা দেখা যাবে, সেখানেই ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বিপ্লবের পর মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। চট্টগ্রামে কোনো ধরণের দখলদারি বা সিন্ডিকেটবাজি সহ্য করা হবে না। সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান থাকবে।’
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য: সংবিধান সংস্কার ও সমন্বয় অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান অবস্থাকে কেবল প্রচলিত বা গতানুগতিক সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি একটি বিশেষ বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতি।’ এ সময় তিনি বিএনপি সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে যেন তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদে যোগ দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে গতি ফিরিয়ে আনেন।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, সংসদ এবং সংস্কার পরিষদকে একই দিনে কার্যকর করতে হবে। অন্যদিকে, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ রমজান পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের প্রতিটি ওয়ার্ডে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘বিপ্লবীদের সংগঠিত থাকতে হবে যাতে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।’
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মিলনমেলা নগরীর একটি অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। এছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ইফতারের আগে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য মূলত সরকারের ভেতরকার বা বাইরের কোনো একটি মহলের প্রতি সরাসরি সংকেত, যারা বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। এনসিপির এই কঠোর অবস্থান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে তারা আপসহীন।
চট্টগ্রামের এই ইফতার মাহফিলটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এনসিপির জন্য একটি রাজনৈতিক শক্তির মহড়ায় পরিণত হয়েছিল। নাহিদ ইসলামের ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুঁশিয়ারি মূলত জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্জিত জনরায়ের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকরা। আদালত, সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার—এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নতুন বাংলাদেশ কতদূর এগোবে, তার পথরেখা এই ধরণের রাজনৈতিক আলোচনা থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই এখন রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।