ভোটে কারচুপির অভিযোগ: উচ্চ আদালতে বিএনপির আরও ৪ প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ, ব্যালট ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ

Image 8

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপি, অনিয়ম এবং ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ তুলে আইনি লড়াই জোরদার করছেন রাজপথের প্রধান দল বিএনপির প্রার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির আরও চার প্রার্থীর করা পৃথক নির্বাচনী আবেদন (Election Petition) শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর নির্বাচনী ফলাফল এখন আইনি পর্যালোচনার মুখে পড়ল, যা দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আদালতের কঠোর নির্দেশনা ও শুনানির দিনক্ষণ

আবেদনগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করার পাশাপাশি আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সংশ্লিষ্ট চার আসনের নির্বাচনী ব্যালট পেপার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফল ঘোষণার যাবতীয় নথিপত্রসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্দেশনার ফলে ব্যালট পুনঃগণনা বা জালিয়াতি প্রমাণের পথ সুগম হলো।

আদালতের সূচি অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম ও রংপুরের তিনটি আসনের শুনানি আগামী ৬ মে অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, রাজশাহী-১ আসনের জন্য শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ১৩ মে। নির্দিষ্ট এই দিনগুলোতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা এবং আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হবে।

যে চার আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে

বিএনপির যে চারজন হেভিওয়েট প্রার্থী আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন, তারা হলেন:

১. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ (কুড়িগ্রাম-২): উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে তিনি অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। শুরু থেকেই তিনি ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছিলেন।
২. এমদাদুল হক ভরসা (রংপুর-৪): রংপুরের অন্যতম প্রভাবশালী এই প্রার্থী ভোটের ফল পুনরায় গণনার দাবি জানিয়েছেন।
৩. মো. সাইফুল ইসলাম (রংপুর-৬): এই আসনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
৪. মেজর জেনারেল (অব.) মো. শরীফ উদ্দীন (রাজশাহী-১): রাজশাহীর এই আসনটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ছিল। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোটের হার এবং সিসিটিভি ফুটেজ গায়েবের অভিযোগ এনেছেন।

অল্প ভোটের ব্যবধান ও পুনঃগণনার দাবি

আবেদনকারী প্রার্থীরা সবাই নিজ নিজ আসনে অত্যন্ত অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তাদের প্রধান দাবি হলো, নির্বাচনের দিন অনেক কেন্দ্রে প্রকৃত ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং গণনার সময় কৌশলে তাদের প্রাপ্ত ভোট কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় সেগুলো নিষ্ক্রিয় ছিল অথবা ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়নি। আইনি প্রক্রিয়ায় তারা এখন বিতর্কিত কেন্দ্রগুলোর ভোট পুনঃগণনা এবং বিজয়ী প্রার্থীদের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় গেজেট প্রকাশের দাবি জানাচ্ছেন। এর আগে একই ধরণের অভিযোগে শেরপুর, ঢাকা ও গাইবান্ধাসহ আরও বেশ কিছু আসনের আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছিলেন হাইকোর্ট, যা প্রমাণ করে যে ত্রয়োদশ সংসদের অনেক আসনের ফলাফলই এখন আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভর করছে।

রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার আভাস

বিএনপি প্রার্থীদের এই আইনি তৎপরতাকে দলটির একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি পথে নির্বাচনের "অনিয়ম" সামনে আনা সরকারের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এবং বিজয়ী প্রার্থীরা এসব অভিযোগকে "ভিত্তিহীন" বলে দাবি করলেও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা এখন আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্যালট পেপার ও সিসিটিভি ফুটেজ যদি সংরক্ষিত থাকে, তবে পুনঃগণনায় চমকপ্রদ কিছু ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও, এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন রয়েছে, উচ্চ আদালতের এই হস্তক্ষেপ তা নিরসনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ৬ মে এবং ১৩ মে’র শুনানির দিকে এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং কোনো আসনের ফলাফল বাতিল হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন আদালতের নির্দেশ কতটা নিষ্ঠার সাথে পালন করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন: বিচার বিভাগ ও গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী বিল আনছে সরকার: সংসদে ১৬ অধ্যাদেশ বাতিলের নেপথ্য কারণ

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন