বিশ্বকাপের এক অদ্ভুত ইতিহাস: সুযোগ পেয়েও ১৯৫০ আসর কেন বর্জন করেছিল ভারতসহ ৬ দেশ?

Image 16

বর্তমান সময়ে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা যেকোনো জাতির জন্য সর্বোচ্চ গৌরবের বিষয়। চার বছর পর পর আসা এই মহাযুদ্ধের মঞ্চে জায়গা করে নিতে প্রতিটি দেশ তাদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এমন এক অবিশ্বাস্য অধ্যায় রয়েছে, যেখানে বাছাইপর্বের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবা সরাসরি আমন্ত্রণ পেয়েও ছয়টি দেশ বিশ্বমঞ্চে পা রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেই রহস্যময় ঘটনাপ্রবাহ আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক চরম বিস্ময়।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেই আসরটি হওয়ার কথা ছিল ১৬টি দল নিয়ে। কিন্তু ভারতসহ মোট ছয়টি দেশ শেষ মুহূর্তে নাম প্রত্যাহার করে নেয়ায় ফিফা চরম বিপাকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দল নিয়ে টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়ায়। কেন আজকের দিনের এই ‘সোনার হরিণ’ সুযোগটি সে সময় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল এই দেশগুলো? চলুন জেনে নিই সেই নেপথ্যের কারণগুলো।

ভারত: খালি পা নাকি আর্থিক সংকট?

১৯৫০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারতের নাম প্রত্যাহার নিয়ে সবচেয়ে মুখরোচক ও জনপ্রিয় দাবিটি হলো—ফিফা ফুটবলারদের খালি পায়ে খেলার অনুমতি দেয়নি, তাই ভারত অংশ নেয়নি। তবে ঐতিহাসিক ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। প্রকৃতপক্ষে, ব্রাজিল ভ্রমণের বিশাল আকাশচুম্বী খরচ বহন করা সেই সময়ের অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। এছাড়া তৎকালীন ভারত সরকার ও ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বকাপের চেয়ে অলিম্পিক গেমসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল, যা তাদের বিশ্বকাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

স্কটল্যান্ড ও পর্তুগাল: অদ্ভুত জেদ আর আত্মমর্যাদা

১৯৫০ আসরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্কটল্যান্ড ও পর্তুগালের সিদ্ধান্ত ছিল বেশ বিচিত্র।

  • স্কটল্যান্ড: স্কটিশদের জেদ ছিল পাহাড়সম। তাদের পরিষ্কার শর্ত ছিল—বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে তারা বিশ্বকাপে যাবে না। বাছাইপর্বে রানার্সআপ হওয়ায় তারা স্বেচ্ছায় সুযোগটি প্রত্যাখ্যান করে আত্মমর্যাদা রক্ষার উদাহরণ তৈরি করে।
  • পর্তুগাল: ফিফা পর্তুগিজদের এই টুর্নামেন্টে খেলার জন্য বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তারা সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল—মাঠে সরাসরি লড়াই করে জয়ী না হয়ে অন্যের দয়ায় তারা বিশ্বকাপে খেলতে যাবে না।

ফ্রান্স ও তুরস্ক: যাতায়াত ক্লান্তি ও দূরত্বের অজুহাত

ফুটবল পরাশক্তি ফ্রান্স এবং তুরস্কের না যাওয়ার পেছনে কাজ করেছিল দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা।

  • ফ্রান্স: ফরাসিরা শুরুতে রাজি থাকলেও টুর্নামেন্টের সূচি দেখে বেঁকে বসে। ব্রাজিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ম্যাচ খেলাকে তারা ‘অত্যধিক ক্লান্তিকর’ ও অসম্ভব মনে করে নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
  • তুরস্ক ও আয়ারল্যান্ড: এই দুই দেশের জন্য প্রধান বাধা ছিল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ব্রাজিলে পৌঁছানোর দীর্ঘ ভ্রমণের বিশাল ব্যয়ভার। প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পেরে তারা শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়।

আজকের দিনে যেখানে একটি দেশ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করলে জাতীয় উৎসব শুরু হয়, সেখানে ১৯৫০ সালের এই ঘটনাগুলো আধুনিক ফুটবল বিশ্বে এক অলীক কল্পনা মনে হতে পারে। বাছাইপর্বের কঠিন লড়াই পার করেও এই দেশগুলোর অংশ না নেওয়া ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য ও রহস্যময় অধ্যায় হয়ে টিকে আছে। মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নতি, আর্থিক সংকট এবং বিশ্বকাপের তৎকালীন তুলনায় কম গুরুত্বই এই গণ-প্রত্যাহারের মূল কারণ ছিল। তবে ভারত বা স্কটল্যান্ডের মতো দেশগুলো যদি সেবার অংশ নিত, তবে হয়তো ফুটবল ইতিহাসের পরিসংখ্যান আজ অন্যরকম হতে পারত।

আরও পড়ুন: সব শঙ্কা উড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে ইরান: ফিফার অনড় অবস্থান

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন