জাপান সফরে তারেক রহমান: ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব

জাপান সফরে তারেক রহমান: ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: চার দিনের সরকারি সফরে জাপান গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে তিনি রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়েন। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তাঁর।

সফরের প্রধান উদ্দেশ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করা, নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে তাকাইচির দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। ওই বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ ঘোষণায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অতিথি হবেন।

এক নজরে

  • চার দিনের সফরে জাপানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ২৭ অক্টোবরে
  • ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাবের পরিকল্পনা
  • আলোচনাধীন আটটি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে তিন থেকে চারটি সই হওয়ার সম্ভাবনা
  • ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়নই মূল অগ্রাধিকার

বিনিয়োগ প্যাকেজে ১২ খাত, প্রস্তাব ১৪ বিলিয়ন ডলারের

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দেশীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর মধ্যে পরিবহন, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজার ও অবকাঠামোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে।

আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে গত ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়ন। জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা জোরদার করাও এজেন্ডায় রয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হবে।

আট সমঝোতা স্মারক, সই হতে পারে তিন-চারটি

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, কৃষি, মৎস্য, জনশক্তি উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার আধুনিকায়ন—এসব ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনাধীন আটটি দলিলের মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালেই সই হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আলাদা চুক্তিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জাপানের সহায়তায় বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই রাজনৈতিক সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা নিয়েও দুই পক্ষ মত বিনিময় করবে।

জাপানি বিনিয়োগে আস্থার ভিত্তি কী

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) জরিপে এশিয়া ও ওশেনিয়ার ২০টি দেশের ৫৭টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দেখা গেছে, ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে ব্যবসা সম্প্রসারণের শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে দেখে। একই জরিপে ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দেশটির উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলেছে। কম মজুরি ও উৎপাদন ব্যয়ের কারণে লাভজনকতার বিচারে ওই ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।

এ আস্থার অন্যতম প্রতীক নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানগত গুরুত্ব বিবেচনায় জাপান বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট উদ্যোগেও দেশটিকে কেন্দ্রে রেখেছে। ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারত্ব কেবল সহায়তা নয়, উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলেও বিস্তৃত হচ্ছে।

রপ্তানি ও শ্রমবাজারে বড় সুযোগ

জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথমবার এক বিলিয়ন ডলার ছাড়ায় এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। জাপান এখন বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য এবং এশিয়ায় দ্বিতীয়। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে, যা জাপানের বাজারে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

শ্রমবাজারে সুযোগ আরও বড়। গত বছরের মে মাসে পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের যে চুক্তি হয়, তার ধারাবাহিকতায় গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়েছে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক পাঁচ বছরের সমঝোতা স্মারক। আগামী ১ এপ্রিল থেকে এ চুক্তির আওতায় জাপানে কর্মী নিয়োগ শুরু হবে এবং এটি আরও পাঁচ বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নযোগ্য।

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিমেট) তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদেশে গেছেন এক কোটি ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী, যাঁদের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য দুই শতাংশ জাপানে গেছেন। অথচ জাপানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যার অনুপাত ইতিমধ্যে ২৮ শতাংশ, আর ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৬৪ লাখ কর্মীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। দুই দেশের এই চাহিদা ও সক্ষমতার মিল এমনিতেই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

নারিতা থেকে নাগোয়া: সফরের কর্মসূচিতে কী আছে

জাপানে অবস্থানের সময় প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগ এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতায় রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি) ও জেট্রো প্রধানের পাশাপাশি সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক। পরিকল্পনায় আছে চিবা প্রদেশের ফুৎসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ায় ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শন।

কূটনৈতিক ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়

স্বাধীনতার পর জাপান প্রথম সারির যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তাদের একটি। মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের এ সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে সেখানে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা। বিমানবন্দরে তাঁদের বিদায় জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদসহ মন্ত্রিপরিষদ ও দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা।

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0 ও CC BY 4.0)

ডিঙ্গি নিউজ ডেস্ক | Dingi News

সর্বশেষ পোস্ট

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন