ফিফা আসিয়ান কাপ ২০২৬-এর অভিষেক আসরে হার দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে পরাজিত হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘এ’ গ্রুপের ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে মালয়েশিয়া। বিপরীতে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ খুব একটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি।
বাংলাদেশের বিপক্ষে মালয়েশিয়ার জয়ের মূল নায়ক ছিলেন আরিফ আইমান হানাপি। প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করে তিনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে দেন। বিরতির পর ৫২ মিনিটে বার্গসন দা সিলভা তৃতীয় গোলটি করলে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।
শুরু থেকেই মালয়েশিয়ার চাপ
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে চাপে রাখে মালয়েশিয়া। দ্রুত পাস, দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে তারা। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণকে ম্যাচের শুরুতেই পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। চতুর্থ মিনিটে কর্নার থেকে আসা একটি প্রচেষ্টা তিনি ঠেকিয়ে দেন।
তবে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক আক্রমণ বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি বাংলাদেশের রক্ষণ। ১৮ মিনিটে প্রথম গোলটি করেন আরিফ আইমান। মাঝমাঠ থেকে নোয়া লেইনের পাস পেয়ে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের ফাঁক কাজে লাগিয়ে গোল করেন মালয়েশিয়ার এই উইঙ্গার। তাঁর নিচু শট বাংলাদেশের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে।
গোল হজমের পর বাংলাদেশ ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও মালয়েশিয়ার চাপ কমেনি। বরং বলের দখল ও আক্রমণের ধারাবাহিকতায় প্রতিপক্ষই এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন আক্রমণ দেখা গেলেও সেগুলো মালয়েশিয়ার রক্ষণে বড় কোনো সমস্যা তৈরি করতে পারেনি।
বিরতির আগে দ্বিতীয় ধাক্কা
প্রথমার্ধের শেষদিকে আবারও গোলের দেখা পায় মালয়েশিয়া। ৩৮ মিনিটে বাংলাদেশের নিজেদের অর্ধে একটি ভুল পাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় গোল করেন আরিফ আইমান। ভুল থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণ সাজায় মালয়েশিয়া। সেই আক্রমণের শেষ ধাপে আইমান নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন।
প্রথমার্ধ শেষ হয় ২-০ ব্যবধানে। ফলে বিরতির পর বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরতে হলে দ্রুত একটি গোল করে ব্যবধান কমানোর প্রয়োজন ছিল।
বাংলাদেশের প্রধান কোচ থমাস ডুলি দ্বিতীয়ার্ধে দলকে আক্রমণাত্মকভাবে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তবে মালয়েশিয়ার সংগঠিত রক্ষণ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশের আক্রমণ ধারাবাহিকতা পায়নি। ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ বলের দখল পেলেও শেষ তৃতীয়াংশে গিয়ে কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধেও মালয়েশিয়ার আধিপত্য
বিরতির পর বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। ৫২ মিনিটে মালয়েশিয়া তৃতীয় গোলটি করে। ডান প্রান্ত থেকে আসা বল নিয়ন্ত্রণ করে বাঁ পা দিয়ে সেটি সামলে ডান পায়ের শটে গোল করেন বার্গসন দা সিলভা। বাংলাদেশের গোলরক্ষক শ্রাবণ বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সেটি জালে জড়ায়।
এই গোলের পর ম্যাচের ফলাফল অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যবধান কমানোর জন্য কয়েকটি আক্রমণের চেষ্টা করলেও মালয়েশিয়ার রক্ষণভাগ তা সামলে নেয়। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ৩-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মালয়েশিয়া।
ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আক্রমণভাগে কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে না পারা। অন্যদিকে মালয়েশিয়া দ্রুত আক্রমণ এবং বাংলাদেশের ভুল কাজে লাগিয়ে তিনটি গোল আদায় করে নেয়। বাংলাদেশ মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি সুযোগ তৈরি করতে পেরেছিল এবং সেগুলো থেকেও গোলের দেখা মেলেনি।
বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে
মালয়েশিয়ার কাছে হারের ফলে ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের শুরুটা হলো পয়েন্টশূন্য অবস্থায়। এই গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে মালয়েশিয়া, স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর। FIFA-এর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ ২৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে। একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচটি।
গ্রুপ পর্বের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি দল নিজেদের গ্রুপের অন্য দলগুলোর বিপক্ষে একবার করে খেলবে। গ্রুপ ‘এ’ ও ‘বি’-র চ্যাম্পিয়নরা ফাইনালে মুখোমুখি হবে। দুই গ্রুপের রানার্সআপদের জন্য রয়েছে ব্রোঞ্জ ফাইনাল।
তাই মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারলেও বাংলাদেশের সামনে গ্রুপ পর্বে আরও দুটি ম্যাচ রয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচে ফল বদলানোর পাশাপাশি গোল ব্যবধানও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অভিষেক আসরে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ফিফা আসিয়ান কাপের এবারের আসরটি এই প্রতিযোগিতার প্রথম সংস্করণ। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া ও হংকংয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে টুর্নামেন্ট। মোট ১৪টি জাতীয় দল দুটি ডিভিশনে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ১১টি দল ASEAN সদস্য এবং তিনটি দল অতিথি হিসেবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।
ডিভিশন-১-এর ‘এ’ গ্রুপে রয়েছে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর। এই গ্রুপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়। অন্যদিকে ডিভিশন-১-এর ‘বি’ গ্রুপে রয়েছে ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন।
অভিষেক ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে মালয়েশিয়া। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল, দ্রুত পাসিং এবং বাংলাদেশের ভুল কাজে লাগানোর সক্ষমতা ফলাফলে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে প্রথম ম্যাচের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে দ্রুত পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষ করে রক্ষণভাগের সমন্বয়, মাঝমাঠে বল ধরে রাখা এবং আক্রমণভাগে সুযোগ তৈরি করার জায়গাগুলোতে উন্নতির প্রয়োজন দেখা গেছে।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ২৮ সেপ্টেম্বরের ম্যাচ তাই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ।
ম্যাচের ফল
বাংলাদেশ ০–৩ মালয়েশিয়া
⚽ ১৮ মিনিট: আরিফ আইমান হানাপি
⚽ ৩৮ মিনিট: আরিফ আইমান হানাপি
⚽ ৫২ মিনিট: বার্গসন দা সিলভা
ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।